• রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠের কার্যক্রমে জোর দিতে হবে

স্বাধীন ভোর ডেস্ক / ৪৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় বৃহস্পতিবার, ১০ আগস্ট, ২০২৩

দেশে প্রতি বছরই এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন মহামারি আকার ধারণ করছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ (৯ আগস্ট) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৫২ জনের। এ বছর এখন পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৬৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ছাড়া পেয়েছেন ৬৫ হাজার ২৯০ জন।

রাজধানীতে এই জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসহ তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নগরবিদ, পরিবেশবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা। একই সঙ্গে সরকারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, রাজউক, গণপূর্ত অধিদফতর, রিহ্যাবসহ নানা প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

মশা নিধনে বিগত বছরের তুলনায় এ বছর নতুন নতুন উপায় প্রয়োগ করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। নতুন ওষুধ প্রয়োগ, শিশুদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বই বিতরণ এবং মাঠ পর্যায়ে মশক নিধনে তিন স্তরে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম।

ডিএনসিসি সূত্রে বলা হয়, প্রথম স্তরে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্স কমিটি কাজ করবে। এই কমিটি নিজ নিজ এলাকায় ঘুরে এডিসের লার্ভার উৎসস্থল চিহ্নিত করবে, লার্ভা ধ্বংসে ব্যবস্থা নেবে, কোন কোন বাড়িতে ডেঙ্গু রোগী আছে সেই তালিকা করবে এবং কমান্ড সেন্টারের সার্ভারে মশক নিধন কার্যক্রমের ডাটা এন্ট্রি দেবে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে র‍্যাপিড অ্যাকশন টিম। টাস্কফোর্স কমিটির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই টিম সেখানে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে মেয়রের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং টিম।

এসব কার্যক্রম ছাড়াও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ডিএনসিসির কর্মীদের সঙ্গে একত্রে কাজ করছেন বাংলাদেশ স্কাউট ও বিএনসিসির সদস্যরা। তারা ডিএনসিসির প্রত্যেক অঞ্চলে মাইকিংসহ লিফলেট বিতরণ ও জনগণকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার বিষয়ে সচেতন করছেন। এছাড়া মশার লার্ভা পেলে বাসা ও প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করছেন ডিএনসিসির ম্যাজিস্ট্রেট ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আগের পদ্ধতিতেই মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাশাপাশি জরিমানা করছে বিভিন্ন বাসা ও প্রতিষ্ঠানকে।

এত কিছুর পরেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে করা সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে মাঠ পর্যায়ে মশা নিধন কার্যক্রমে দুর্বলতা ও নগরবাসীর অসচেতনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি ডিএনসিসির কয়েকটি ওয়ার্ডে সকালে মশা নিধন কার্যক্রমে সরেজমিন দেখা যায়, সকাল ৮টায় মেশিন নিয়ে নির্ধারিত এলাকায় যান মশা নিধন কর্মীরা। তার আগে সুপারভাইজাররা অ্যাপের মাধ্যমে কর্মীদের উপস্থিতি জেনে নেন। এটা সরাসরি ডিএনসিসির কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হয়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে ওষুধ ছিটানোর কাজ। প্রত্যেক এলাকায় সপ্তাহে দুইবার এই ওষুধ দেওয়া হয়।

মশা নিধন কর্মীরা জানান, অ্যাপের মাধ্যমে হাজিরা হওয়ায় কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কর্মী সংকটের কারণে চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। পুরো এলাকা কাভার করা কষ্টকর। এছাড়া বাসাবাড়িতে মশার ওষুধ ছিটানোর সময় কখনও কখনও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

তারা বলেন, সকালে অনেক বাড়ির গেট খুলতে চায় না। অনেক বাড়ির ছাদে যেতে দেয় না। একবার এলাকা ত্যাগ করলে পরে আর আসার সুযোগ হয় না।

ছোট ছোট ড্রেনে ময়লা জমে থাকায় পানির স্রোত থাকে না। এতে এক পাশে মশার ওষুধ ছিটালে তা বেশি দূর গড়াতে পারে না। ড্রেনের ওপর স্ল্যাব থাকায় নিচের অবস্থা দেখা সম্ভব হয় না। তারা বলেন, ওষুধ ছিটানোর সময় ড্রেন ও রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা অপসারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকলে ভালো হয়।

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মশা নিধন কর্মী জিয়া বলেন, এখন বেশি কাজ করা লাগছে। আমাদের কাউন্সিলর স্যার যেভাবে খোঁজ-খবর নেন, সবাই যদি এভাবে করেন, তাহলে কারও কাজে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে লোক আরও বেশি হলে ভালো। কিছু কিছু এলাকা এত বড় যে একা কাভার করা যায় না। মাঝে মাঝে আরেকজন বাড়িয়ে দেয়। তবে লোক আরও দরকার।

তিনি বলেন, রাস্তায় আশপাশে যেখান মশার লার্ভা থাকার সম্ভাবনা বেশি সেখানে ওষুধ ছিটাই। অনেক বাসাবাড়িতে গেলে বাধা পাই। এসব বাসার লোকেরা সচেতন হলে মশা অনেক কমে যাবে। ডিএনসিসির সুপারভাইজার নুরনবী বলেন, আমার আন্ডারে ১৯ জন আছে। সবারই বেশ পরিশ্রম হচ্ছে। এখানে ফাঁকির কিছু নেই। ১০০ পার্সেন্ট না পারলেও অন্তত ৯০ পার্সেন্ট কাজ করতেই হয়। আমি প্রত্যেক এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খিলগাঁও এলাকার এক সুপারভাইজার বলেন, আমার এখানে কাজ করছে ৮ জন। একটি নষ্ট হওয়ায় ৭টি মেশিনে কাজ চলে। ফগার ৯টা। আমার লোকের সমস্যা নাই। বাড়ির মালিকরা যদি পরিষ্কার না রাখে, তাহলে যতই কাজ করি, মশা কমানো যাবে না। এই এলাকা নিচু। একজনের বাড়িতে পানি জমলে সমস্যা হয়। কোনও ড্রেন নাই। এলাকায় ডোবা-নালা বেশি। নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকে। এখানে বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, কিছু কিছু এলাকায় দুই ওয়ার্ডের সমান মানুষ থাকে। কাউন্সিলর অফিস থেকে হেঁটে যেতে লাগে আধাঘণ্টা। তাদের সাইকেলও নাই। আমারও হেঁটে যেতে হয় তাদের পিছে পিছে। প্রত্যেক দিন সবাইকে খেয়াল করা যায় না। দুই একজনের সঙ্গে যাই। বাকিদের ফোন দিয়ে খোঁজ নিই।

মশা মারতে ফিল্ডে জোর দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ফিল্ডের ওপর চাপ দিতে হবে। যারা ডাক্তার আছেন ফিল্ডে কাজ করে তারা যদি ঠিকমতো আসতেন, দেখতেন কর্মীরা কী করে। কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে শাস্তি দিতে হবে। তাহলে কাজে গতি আরও বাড়বে। আরেকটা পরামর্শ হলো, একজন প্রত্যেক দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে শুধু লার্ভার খোঁজ করবে। যেখানে পাবে সেখানেই ধ্বংস করে দেবে। এভাবে কাজ করলে মশার লার্ভা পাওয়াই যেত না।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ও নগরবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা লাগে। এসব মশার জীবনচক্র, ধরন জানা এবং সেই অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটার জন্য কীটতত্ত্ববিদ প্রয়োজন। এর সঙ্গে উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞ, ভূতত্ত্ববিদের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এডিস মশা মারার ওষুধের মান যাচাইয়ের জন্যও একজন থাকা জরুরি। এসব ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদে কোনও সমাধান আসবে না। বরং ডেঙ্গু আরও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই দেখছি সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অধিকাংশ সময় ওষুধ ছিটানো পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে কমিউনিটি পর্যায়ে অংশগ্রহণ জরুরি।

মশা নিধনে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বয়ে কাজ করতে হবে জানিয়ে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এখন তো ডেঙ্গু অনেক ছড়িয়ে গেছে। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কুলাতে পারছে না। প্রত্যেক বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মশা নিধন কার্যক্রম এদের দিয়ে হয়তো সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সবারই কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্তের যে প্রজেক্টগুলো আছে, সেখানে এডিস মশার প্রজনন যেন না হয় সেটা নিশ্চিত করতে পারে। রাজউক, ওয়াসাসহ যেসব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে, যে যার জায়গা থেকে এডিস মশা নির্মূলে কাজ করতে পারে। এছাড়া রিহ্যাবের কথা যদি বলি, তারা যে বিল্ডিংগুলো করছে সেখানেও কাজ করতে পারে। নির্মাণাধীন ভবনেও আমরা প্রচুর লার্ভা দেখি। এছাড়া মশা নিধনে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কাজ করতে পারে। এভাবে নিশ্চিত করতে হবে এডিস মশার প্রজনন যেন না হয়।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, মশক নিধনে প্রত্যেক দিনই নতুন কিছু কনসেপ্ট আমরা নিয়ে আসতে চাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি। এখন এমন কোনও দিন নাই যে আমাদের টিম বাইরে যাচ্ছে না। মশক নিধন টিম ছাড়াও আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং টিম, অন্যান্য টিম থেকে স্পেশালিস্টরা ডিএনসিসির ১০ অঞ্চলে গিয়ে লার্ভা পেলে জরিমানা করছে। আমরা কল সেন্টারের মাধ্যমে নগরবাসীকে বাসার আশপাশের কথা জানাচ্ছি, সতর্ক করছি। এছাড়া কীটবিদের পরামর্শ অনুযায়ী মশার ওষুধ দিচ্ছি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, এসএমএস, মাইকিং, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সচেতন করা, জরিমানা, এগুলো চলতেই থাকবে।

তিনি বলেন, আমাদের টোটাল সিস্টেমের সঙ্গে আর কী কী সংযোজন বা নতুন কিছু কী করা যায় সেটা ভাবছি। আমরা কলকাতা ও মায়ামিতে দেখেছি মশা নিধনে তারা বিটিআই কীটনাশক ব্যবহার করে। আমরাও তা ব্যবহার শুরু করছি। এত কিছুর পরও মশা নিধনে গ্যাপটা কোথায় এটা আমারও প্রশ্ন। তাহলে নিশ্চয়ই আরও বেশি সচেতনতা বাড়াতে হবে, আরও বেশি জরিমানার দিকে ঝুঁকতে হবে। মানুষকে আরও সম্পৃক্ত করতে হবে, স্কুল-কলেজে, বাচ্চাদের আরও সচেতন করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং বাড়ানো হবে জানিয়ে মেয়র আতিক বলেন, আমি ইভিউলেশনের ওপর জোর দেবো। এই ইভিউলেশন সিটি করপোরেশনের কাউকে দিয়ে করাবো না। থার্ড পার্টি দিয়ে করাবো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটবিদদের বলেছি এডিস মশার মৌসুমের আগেই লার্ভার উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করে দেবেন। জিআইএস ম্যাপের মাধ্যমে আমাদের মনিটরিং টিম গিয়ে সেগুলো ধ্বংস করবে। এরপর থার্ড পার্টির যে ইভিউলেশন টিম আছে তারা মনিটরিং করবে ধ্বংস হয়েছে কিনা। আরেকটি বিষয় আমার মাস্টারপ্ল্যানে আছে, ডিএনসিসির প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক করবো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ