• রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

সিরাজগঞ্জে শীতের আগমনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কম্বল তৈরির কারিগররা

স্বাধীন ভোর ডেস্ক / ৭২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৩

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার শিমুল দাইড় বাজার। শীত পড়তে না পড়তেই সরগরম হয়ে উঠেছে কম্বল পল্লী বলে খ্যাত কাজিপুর উপজেলার চালিতা ডাঙ্গা ইউনিয়নের শিমুল দাইড় বাজার। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও এই শীতের আগমনে কম্বল তৈরির কাজে ব্যাস্ত সময় পার করছেন এই কম্বল পল্লীর কারিগররা। প্রতিবছর শীতের আগমনে এই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে,পাড়া, মহল্লার পরিবার গুলোর মাঁঝে যেন সৌভাগ্যর বার্তা নিয়ে বাড়তি আয়ের সূযোগ সৃষ্টি করে দিতে আসে। কাজিপুরে প্রায় ৩০ গ্রামের ২০ হাজার কারিগর এই কম্বল তৈরি কাজের সাথে জরিত।এই এলাকায় প্রথমে কম্বল তৈরির কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। তার পর থেকে প্রতিবছরই এই কম্বল পল্লীতে কম্বল তৈরির কারখানা ও কাজ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।স্থানীয় ব্যাবসায়ীদের সূত্রে কাজিপুর উপজেলার শিমুল দাইড় বাজারেই বড় ছোট মিলে প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী রয়েছে। শুরুতে এই অঞ্চলে কম্বল বলতে শূধু জোরা তালি দেয়া বা গার্মেন্টের ঝুঁট কাপর দিয়ে কম্বল তৈরি হত ।সময়ের ব্যবধানে এর পরিধি বেড়ে একাধিক নাম ও মানের কম্বল তৈরি হচ্ছে এখানে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাজিপুর উপজেলার চালিতা ডাঙ্গা ইউনিয়নের শিমুল দাইড় বাজার মেঘাই,সালাভরা কুনকুনিয়া, মাইজবাড়ি,চালিতাডাঙ্গা,নয়াপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে ঢাকা থেকে গার্মেন্টস এর ঝুঁট কাপর বা টুকরো কাপড় নিয়ে এসে কেঁচি দিয়ে সাইজ করে কেটে পা মেশিন ও ফ্লাডলক মেশীন দিয়ে সেলাই করে কম্বল তৈরি করছেন। এতে এই এলাকায় কম্বল তৈরির কাজে ব্যাস্ত সময় পার করছে কারিগররা।শিমুল দাইড় গ্রামের আলতাফ ও তার সহকর্মী বলেন,গার্মেন্টস থেকে ঝুট ও টুকরো কাপর সংগ্রহ করে এনে বিভিন্ন ছোট বড় সাইজ অনুযায়ী কেটে ফ্লাডলক মেশিন দিয়ে সেলাই করে ছোট বাচ্চাদের হুডি, পায়জামা,গেঞ্জি, কম্বল তৈরি করি।এর পরে তৈরি পোশাক গুলো গুছিয়ে সাজিয়ে রাখি। এখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খুচরা বিক্রেতা এসে পাইকারি দামে পোশাক ও কম্বল কিনে ট্রাক ভর্তি করে নিয়ে যায়। দ্রব্যমূল্যের দাম বেশি থাকায় আমরা সঠিক দাম পাচ্ছি না।আমরা কোন রকম ভাবে এগুলো বিক্রি করে চালান তুলছি।শিমুল দাইড় বাজারের ভাইবোন ট্রেডার্স এর মালিক জানান, সেই ১৯৯৪ সালের জোড়াতালির কম্বল ছাড়াও এ অঞ্চলে বিস্বাস,চায়না,এ্যামব্রাশ, ৩ ডি,৫ ডি, ৬ডি নামের উন্নত মানের কম্বল তৈরি হচ্ছে। জোড়াতালি বা ঝুট থেকে তৈরি কম্বল ৯০ টাকা থেকে ৪শ টাকা, বাংলা ১৩০ থেকে হাজার টাকা,এবং বিস্বাস,চায়না,এ্যামব্রাশ, ৩ ডি,৫ ডি ৬ডি নামের কম্বল গুলো মান ভেদে ৪শ থেকে ৭/৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পা,মেশীনের কারিগর রা প্রতিপিস কম্বল তৈরিতে মজুরী বাবদ ৫০/৭০ টাকা করে পেয়ে থাকেন। আর ফ্লাডলক মেশিনে একেকজন শ্রমিক ৮শ থেকে ৯শ পিস কম্বল তৈরি করে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রতিপিস কম্বলের ওজনের পরিমাফে ১ টাকা থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। মেয়েদের কম্বল তৈরিতে মজুরী কম হলেও গৃহস্থালীর কাজের ফাঁকে শীত মৌসুমে পরিবারের মেয়ে ছেলে সকলেই মিলে মিশে কম্বল সেলাইয়ে ব্যাস্ত থাকায় একক চাপ থাকে না ফলে সহযেই পরিবারের সকলে মিলে শীত মৌসুমে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরা সংসারে বাড়তি আয় করে থাকেন। সরজমিনে দেখতে গিয়ে কথা হয় কম্বল তৈরির কারিগর সালাভরা গ্রামের সালমা বেগমের সাথে। সালমা বেগমের ১ ছেলে ১ মেয়ে। মেয়ে ৫ম শ্রেনীতে পড়ে, ছেলে ৩য় শ্রেনীতে। তিনি জানান আমাদের কাজিপুর নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা হওয়ায় পরিবারের পুরুষদের হাতে তেমন কাজ কর্ম থাকে না ফলে, বছর জুরে সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকে। তবে শীত আসলে আমাদের হাতে কম্বল তৈরির বাড়তি কাজ সৃষ্টি হওয়ায় অভাবকে আমরা দুর করতে সক্ষম হচ্ছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় মন দিয়েছে, তবুও সন্তানরা পড়া লেখার ফাঁকে মায়ের সেলাইয়ের কাজে দাদির সাথে টুকরো কাপড় গুছিয়ে মাকে কম্বল তৈরিতে সহযোগিতা করে।আব্দুল মজিদ শিমুল দাইড় বাজারে ফ্লাডলক মেশিনে কাজ করেন, সেখানে তার প্রতিদিন ৮/৯শ টাকার মত আয়রোজগার হয়। আরএভাবেই সংসারের খরচ বাদে ছেলে,ও মেয়েকে লেখাপড়া করাতে আব্দুল মজিদকে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। আত্ম সামাজিক উন্নয়নের এই গল্প কাজিপুরের সালাভরা আব্দুল মজিদের পরিবারের শুধু একার নয়, এই গল্প কম্বল পল্লীর শীতের এই মৌসুমের দুইসহাশ্রাধীক পরিবারের। শিমুল দাইড় বাজারে রয়েছে প্রায় ৩শ এর মত যন্ত্র চালিত ফ্লাডলক পাওয়ার মেশিন,এ ছাড়া অত্র এলাকায় ২০ হাজার হাজারের মত ফ্লাডলক মেশিনে শ্রমিকরা কর্মরত রয়েছে কাজিপুরের শিমুলদাইড় বাজার সমিতির সভাপতি শরিফুল ইসলাম সোহেল জানান, ১৯৯৪ সালে আমাদের এখানে প্রথম গার্মেন্টসের ঝুঁটকাপড় দিয়ে কম্বল তৈরি শুরু করে স্থানীয়ভাবে বেচাকিনি শুরু হয়, এখনে কম্বলের পাশাপাশি ছোট ছেলেমেদের পোশাক সহ প্রায় ৫২ টি আইটেম এই এলাকায় তৈরি হচ্ছে। শিমুল দাইড়ের তৈরি কম্বল সহ অন্যান্য তৈরি সামগ্রী স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষ করে শীতের এলাকা সমুহ রংপুর,দিনাজপুর ,পঞ্চগড় ,ঠাকুরগা অর্থাৎ উত্তাঞ্চলের প্রায় সব জেলাসহ দক্ষিন অঞ্চলের বাগের হাট,কুষ্টিয়া, খুলনা,গোপালগঞ্জ,থেকেও ব্যাপারীমহাজনরা এসে এই কম্বল ক্রয় করে থাকেন। তিনি আরও জানান শীতের এই মৌসুমে শিমুলদাইড় বাজার হতে ২৫/৩০ লক্ষ পিস কম্বল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে। শিমুলদাইড় বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতান জানান এক সময় এই ব্যবসাটি স্থানীয় পর্যায়ে হলেও সময়ের ব্যবধানে এর পরিধি বেড়ে সারাদেশ ব্যাপি বিস্তার লাভ করেছে। তিনি আরও জানান আমাদের স্থানীয় বেপারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন রকমের সহযোগীতা করা হবে। আশাকরছি আগামীতে এই কম্বল ব্যবসাটির আরো প্রসার ঘটবে। কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুখময় সরকার জানান, এখানকার কম্বল সারা বাংলাদেশে যাচ্ছে। মানে গুনে ও দামে কম হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা বাড়ছে। এই কম্বল তৈরির ব্যবসায় অনেক বেকারত্বের অবসান হয়েছে। এখান কার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন রকমের সহযোগীতা করা হবে। আশাকরছি আগামীতে এই কম্বল ব্যবসাটির আরো প্রসার ঘটবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ