• শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ০৭:০৮ পূর্বাহ্ন

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কুরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য। 

স্বাধীন ভোর ডেস্ক / ৬৫ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় রবিবার, ২৫ জুন, ২০২৩

লেখক.  মো. হাফিজুর রহমান 
শিক্ষার্থী : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া 
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইবি শাখা।
কুরবানি শব্দের অর্থ, ত্যাগ, উৎসর্গ, বিসর্জন। কুরবানি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্ব মুসলিমদের জন্য একটি মহৎ ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্য আত্মোৎসর্গ করাই কুরবানি।  শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের  উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পশু যবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়। কুরবানি সম্পর্কে পবিত্র কালামে হাকিমে ঘোষিত হয়েছে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদের  জীবনোপকরণ স্বরুপ, যে সব চতুষ্পদ জন্তুু দিয়েছি সেগুলোর উপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে(সূরা  আল হাজ্ব আয়াত নম্বর: ৩৪)। আদম (আ.) থেকে শুরু করে মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত, সমস্ত নবী রাসূল ও  তাদের অনুসারীরা কুরবানী করেছেন।কুরআনুল কারীম থেকে, আমরা জানতে পারি আদম (আ.) এর  দুই পুত্র  হাবিল ও কাবিলের মাধ্যমে কুরবানির সূত্রপাত হয়। সে   ইতিহাস আমরা কুরআন থেকে জানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে রাসূল আপনি তাদের নিকট আদমের দুপুত্রের সংবাদ পাঠ করে, সত্যতার সাথে  শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করল একজনের  কুরবানি  কবুল করা হয়েছিল, কিন্তু  অপরজনের হয়নি। এক  ভাই বলল আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব, অপর ভাই বলল আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকীদের পক্ষ থেকে কুরবানী কবুল করেন (সূরা আল মায়িদা আয়াত: ২৭)। আমরা সূরা মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতের তাফসীর ও সংশ্লিষ্ট ঘটনা পড়লে বুঝতে পারব, ইতিহাসের প্রথম কুরবানির  সঠিক ও বিস্তারিত বিষয়: আদম (আ.) এর দুপুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনাটি বিশুদ্ধ ও শক্তিশালী সনদ সহ বর্ণিত হয়েছে, ঘটনার বিবরণ হল যখন হযরত আদম (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং প্রজনন ও বংশবিস্তার আরম্ভ হয় তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরুপ যমজ  সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন ভ্রাতা ও ভগিনী ছাড়া আদমের আর কোন সন্তান ছিল না। অথচ ভ্রাতা ও ভগিনী  পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। তাই আল্লাহ তাআলা বাস্তব প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.) এর শরীয়তে এ  নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে জমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে তারা পরস্পর সহোদর ভ্রাতা ভগিনী গণ্য হবে। তাঁদের মধ্যে বৈবাহিক  সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী  গর্ভ  থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ব থেকে জন্মগ্রহণকারীনি কন্যা সহোদর ভ্রাতা ভগিনী  হিসেবে গণ্য হবে না। তাদের পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বৈধ হবে। ঘটনাক্রমে কাবীলের সহজাত সহোদরা বোন ছিলো সুন্দরী,   আর হাবীলের সহজাত সহোদরা বোন ছিলো কুশ্রী, যা কাবিলের ভাগ্য পড়ল। এতে কাবীল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবীলের শত্রুতে পরিণত হলো। সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে, হযরত আদম (আ.) তার শরীয়তের বিধান ঠিক রাখার জন্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। অতঃপর তিনি কাবিল হাবিলের মধ্যে বিরাজমান বিরোধ নিস্পত্তির জন্য বললেন তোমরা উভয়ই আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানি কবুল হবে সে সুন্দরী মেয়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে। আদম (আ.) নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, সত্যপন্থির কুরবানিই গ্রহণযোগ্য হবে। শুধু আদম (আ.) নয়,  আল্লাহর নবী হযরতে নূহ (আ.) হযরত ইয়াকুব (আ.), হযরত মুসা (আ.) সব নবীর উম্মতের উপর কুরবানি ছিলো। মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম, আল্লাহর প্রেমে, স্বীয় পুত্রকে কুরবানি করার মহা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্বরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগের জন্য আদিষ্ট হন ইবরাহীম (আ.) আল্লাহ তায়ালা বলেন, অতঃপর ইসমাইল (আ.) যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মতো বয়স উপনীত হলো তখন ইব্রাহিম (আ.) বলল হে  বৎস আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কি? সে বলল হে আমার আব্বাজান আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে  ধৈর্যশীল সন্তান হিসেবে  দেখতে পাবেন (সূরা সফফাত আয়াত নং: ১০৩)। হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম নিজের জানকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে নির্দ্বিধায় সম্মত হয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা, তাই পিতার ধারালো অস্ত্র দিয়ে সন্তান ইসমাইল (আ.) এর একটি পশম ও  কাটতে পারেনি, পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে জান্নাতের একটি দুম্বা জবাই হয়৷ পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল সর্বকালের  স্রষ্টা প্রেমে সর্বশ্রেষ্ঠ আত্নত্যাগের উদাহরণ। অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য উম্মতি মুহাম্মাদির জন্য কুরবানি করাকে ওয়াজিব করেছেন। পবিত্র কোরআনে হাকিমের রাব্বুল আলামিন বলেন, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তোমাদের কুরবানীর গোশত এবং রক্ত বরং পৌছাই তোমাদের তাকওয়া (আয়াত নম্বর: ৩৭)। কুরবানীর তাৎপর্য ও গুরুত্ব: রাসূল সাঃ বলেন কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে  প্রিয় কোন আমল আল্লাহর কাছে নেই, কিয়ামতের দিন কুরবানির পশু  প্রত্যেকটি  লোম ক্ষুর পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহর  কাছে উপস্থিত। রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায় ( তিরমিজি)। কুরবানীর পরিত্যাগকারীর উপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম কঠোর সতর্কবার্তা পেশ করেছেন, বলেন সামর্থ্য আছে তারপরও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারের কাছেও যেন না আসে (মিশকাত)। মুসলমানদের শুধু কুরবানির প্রতীক হিসেবে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বিশ্ব মানবতার মুক্তি ও বিশ্ব মুসলমানদের কল্যাণের জন্য সবাইকে নিবেদিত প্রাণ হতে হবে। মানুষের অন্তর থেকে পাশবিক চিন্তা চেতনাকে কুরবানি বিসর্জন দিতে হবে। প্রতিবছর কুরবানি পশু হনন করতে আমাদের মধ্যে আসে না, বরং কুরবানির মাধ্যমে পশু প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে, আল্লাহ কে সন্তুষ্টি করার এটি যে একটি উওম মাধ্যম তা পুরো মুসলিম মিল্লাত কে স্বরণ করিয়ে দিতে ঈদুল আযহা প্রতিবছর ফিরে আসে। ঈদুল আজহা আমাদের শেখায়,মালিকের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দাও!মাথা নত করে দাও!কুরবান করে দাও সব সাধ – আহলাদ! নিজের সুখগুলো ভাগ করে দাও গরীব অসহায় সব মানুষের হাতে! ঈদুল আজহার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, সবার মনে,সবার ঘরে। ঈদ মুবারক। তাকাবালাল্লাহু মিন্না ও মিনকুম।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ