প্রশ্নবিদ্ধ ওলামা লীগের ‘স্বীকৃতি’

স্বাধীন ভোর ডেস্ক / ২৯ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশের সময় রবিবার, ২১ মে, ২০২৩

ডেস্ক নিউজঃ-

‘বাল্যবিয়ে নিষিদ্ধ করায় দেশে গর্ভপাত বেড়েছে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন কুফরি।’ ২০১৯ সালের ২১ জুন ঢাকায় এক মানববন্ধন থেকে আসে এমন বক্তব্য। ২০২০ সালে দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দেয়। সংক্রমণরোধে লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে নির্দেশনা আসে মসজিদে সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে সীমিত পরিসরে জামাত আয়োজনের। ওই বছরের ২২ জুন ঢাকায় আরেকটি মানববন্ধনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সেই নির্দেশনাকে বলা হয়েছিল ‘কুফরি মতবাদ’। করোনা মহামারিকে সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ বলে বিশ্বাস করা ‘কুফরি’ ও ‘শিরকি’ ঘোষণা করা হয়। এসব চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্রবাদী বক্তব্য ‘আওয়ামী ওলামা লীগ’ নামে একটি সংগঠনের। বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন ‘ইসলামবিরোধী ও অনৈসলামিক’ আখ্যা দিয়েছিল এই সংগঠনটি। তাছাড়া বিপিএল, আইপিএল খেলা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করারও দাবি জানায় তারা। আওয়ামী ওলামা লীগের নেতারা নিজেদের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কর্তৃক স্বীকৃত বলে দাবি করেন সে সময়। নেতৃত্ব নিয়ে নিজেদের মধ্যে একাধিকবার মারামারিতেও লিপ্ত হয়েছিলেন তারা- যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছিল নানা সমালোচনা। ওলামা লীগের এসব ঘটনা বিব্রত করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে তখন ওলামা লীগের বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। তখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বহু আগে বলে দিয়েছি, ওলামা লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা নেই’। ওলামা লীগের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কোনো সম্পর্ক নেই- গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে এমন বক্তব্যও দিতে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে। দলটির তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিটিতে জানানো হয়েছিল, আওয়ামী ওলামা লীগের নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। তিন বছর আগে যেখানে ওলামা লীগকে অস্বীকার করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, ঠিক তিন বছর পর সেই সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এমনই ঘোষণা আসে দলটির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন দলটির বর্তমান প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ। যিনি তিন বছর আগে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করেছিলেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওলামা লীগের কোনো সম্পর্ক নেই।সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ওলামা লীগকে শেখ হাসিনার পরীক্ষিত সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ওলামা লীগ কি সহযোগী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সেটা নেত্রী ঠিক করবেন। সম্মেলনে আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, এতদিন ওলামা লীগ বিভিন্ন ধারায় চলেছে, বিতর্কিতভাবে চলেছে। আওয়ামী লীগ এককথা বলছে, পেছন থেকে অন্যকথা বলেছে। বিরোধী কথাবার্তা বলা যাবে না। শেখ হাসিনার সরকার যে কথা বলবে, তার সঙ্গে মিলিয়ে আপনাদের কথা বলতে হবে। সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র ঠেকাতে ওলামা লীগকে সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কীভাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়, এটা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত কাজ করছে। চোখ কান খোলা রেখে রাজপথে থাকতে হবে। কোনো ষড়যন্ত্র যাতে শেখ হাসিনার সরকারকে হটাতে না পারে, সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। এদিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী আওয়ামী লীগ যখন অনেকটা সাম্প্রদায়িক মানসিকতা পোষণকারী বিতর্কিত ওলামা লীগকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ এ নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। যদিও প্রকাশ্যে তাদের কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি কি সেটা বুঝতেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ হয়তো সেটা উপলব্ধি করে না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এ দেশে কখনো ধর্মের রাজনীতি হবে না। অথচ এখানে এখন ধর্মের রাজনীতি হচ্ছে। সেখানে আওয়ামী লীগের ওলামা লীগ নামে সংগঠন করার বিষয়ে খুব একটা আশ্চর্যের কিছু দেখছি না। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এটা শুধুই রাজনীতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারের রোজনামচার ১৩৭ পৃষ্ঠায় বলেছেন- আগে গুণ্ডা, পরে পাণ্ডা। এই হলো রাজনৈতিক নেতার সংজ্ঞা। কথা হলো রাজনীতিতে যখন যাকে স্বার্থে লাগে, তখন তাকে ব্যবহার করা হয়। স্বার্থে আঘাত লাগলে ছুড়ে ফেলা হয়। রাজনীতিতে এই ধরনের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক দলের উপকার করে; কিন্তু দেশের সমাজ কিংবা মানুষের কোনো উপকার করবে না। বহু আগেই সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বলেছিলেন- রাজনীতিবিদরা যা বলেন, তা বিশ্বাস করেন না কখনো। আর যা বিশ্বাস করেন তা বলেন না কখনো।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও সংবাদ